এম নূরউদ্দিন আহমেদ, রায়পুরা : নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলায় যেন নেমে এসেছে এক হৃদয়বিদারক শোকের ছায়া। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে পানিতে ডুবে ছয়টি নিষ্পাপ শিশুর প্রাণ ঝরে যাওয়ার ঘটনায় পুরো উপজেলা আজ স্তব্ধ। যে উঠানগুলোতে গতকালও শিশুদের হাসি-আনন্দ, দৌড়ঝাঁপ আর কোলাহলে মুখর ছিল, আজ সেখানে শুধুই কান্নার রোল, স্বজন হারানোর আর্তনাদ আর নিস্তব্ধতার দীর্ঘশ্বাস।
প্রথম মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে গতকাল উপজেলার বড়কান্দা এলাকায়। গোছল করতে গিয়ে পানিতে ডুবে চারজন মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। চারটি শিশুর নিথর দেহ একসঙ্গে বাড়িতে পৌঁছালে স্বজনদের বুকফাটা কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ। কেউ বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না, কিছুক্ষণ আগেও যারা হাসিমুখে খেলাধুলা করছিল, তারা আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। এই ঘটনার শোক কাটতে না কাটতেই গতকাল শুক্রবার আবার রায়পুরা উপজেলার শ্রীনগর ইউনিয়নের ভেলোরচর গ্রামে ঘটে আরেকটি হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা। চকের পানিতে ডুবে প্রাণ হারায় আরও দুই শিশু। দ্বিতীয় দিনের এই মৃত্যুর খবরে পুরো উপজেলাজুড়ে আবারও নেমে আসে শোকের ছায়া। মাত্র একদিনের ব্যবধানে ছয়টি শিশুর মৃত্যু রায়পুরার মানুষের হৃদয়ে গভীর বেদনার সৃষ্টি করেছে।
নিহত শিশুদের বাড়িগুলোতে এখন শুধুই কান্না আর আহাজারি। সন্তানের নিথর দেহ বুকে জড়িয়ে মায়েদের বিলাপ উপস্থিত সবাইকে অশ্রুসিক্ত করেছে। বাবারা নির্বাক, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরা সান্ত্বনার ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না। অনেকেই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। গ্রামের অলিগলি, উঠান আর প্রতিটি ঘরে যেন একটাই প্রশ্ন—এত ছোট ছোট প্রাণগুলো এভাবে কেন ঝরে গেল?
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বর্ষা মৌসুমে খাল, বিল, পুকুর ও জলাশয়ে পানির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় শিশুদের নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। সামান্য অসাবধানতাই ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাই শিশুদের প্রতি সার্বক্ষণিক নজরদারি রায়পুরায় ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে পানিতে ডুবে ৬ শিশুর মৃত্যু স্বজনদের বুকফাটা আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে আকাশ-বাতাস, শোকের মাতমে স্তব্ধ পুরো উপজেলা। সচেতন মহলের মতে, শুধু পরিবারের দায়িত্বই নয়, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই এমন দুর্ঘটনা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। শিশুদের সাঁতার শেখানো, ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয়ে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
একের পর এক এমন মর্মান্তিক ঘটনায় রায়পুরার মানুষ আজ গভীরভাবে শোকাহত। ছয়টি নিষ্পাপ শিশুর অকাল বিদায়ে পুরো উপজেলায় নেমে এসেছে শোকের কালো ছায়া। স্বজনদের চোখের জল আর বুকফাটা আর্তনাদ যেন বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে—একটু সচেতনতাই হয়তো বাঁচিয়ে দিতে পারত এই ছয়টি কোমল প্রাণ।
নিহতরা হলো শ্রীনগর ইউনিয়নের ভেলোয়ারচর গ্রামের নূরউজ্জামানের মেয়ে জান্নাতি (৮), চরসুবুদ্ধি ইউনিয়নের আব্দুল্লাপুর গ্রামের সাদ্দাম মিয়ার মেয়ে নিপা (৭)। নিহতরা পরস্পর মামাতো-ফুফাতো বোন। উল্লেখ্য যে, গতকাল বৃহস্পতিবার উপজেলার চান্দেরকান্দি ইউনিয়নের বড়কান্দা গ্রামে পাশের খালে গোছলে নেমে বড়কান্দা গ্রামের শামীম মিয়ার মেয়ে তাবিয়া (১৩ ), রুবেল মিয়ার মেয়ে আয়েশা (৯), রুবেল মিয়ার মেয়ে জান্নাতি এবং বাদল মিয়ার মেয়ে সুমাইয়া(১১)। তারা সকলেই গাউছিয়া নূরে মদীনা মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ছিলেন।
ঘটনার সততা নিশ্চিত করেছেন রায়পুরা থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মজিবুর রহমান।