
নিজস্ব প্রতিবেদক : নরসিংদীর রায়পুরায় রাতের আঁধারে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। যেন কোন ভাবেই থামানো যাচ্ছে না মেঘনা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন। প্রশাসনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকায় দিনে বালু কাটতে না পেরে রাতের আঁধারে অবৈধ চুম্বক ড্রেজার দিয়ে কাটা হচ্ছে বালু। এতে প্রতি বছরই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ঘর-বাড়ি সহ শত শত বিঘা ফসলী জমি। অথচ উপজেলা প্রশাসন বালু উত্তোলনের ব্যাপারে তাদের জিরো টলারেন্স্ ঘোষণা করেছেন। ইতিমধ্যে একাধিকবার মোবাইল কোর্টও পরিচালনা করা হয়েছে।
সম্প্রতি ইজারা দেওয়া বালু মহলের সীমানা কাতলার চর মৌজা ছাড়িয়ে রায়পুরা উপজেলার চাঁনপুর ইউনিয়নের মাঝের চর, শ্রীনগর ইউনিয়নের আব্দুল্লাহ চর এলাকা থেকে বালু উত্তোলন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর গত ৩১ আগস্ট আব্দুল্লাহ চর থেকে চুম্বক ড্রেজারের মাধ্যমে অবৈধ ভাবে বালু উত্তোলনের সময় দুটি ড্রেজার সহ ৪জনকে আটক করে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শফিকুল ইসলাম। পরে তাদের ভ্রাম্যমাণ আদালতে মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড ও অনাদায়ে ৩ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। সেই সাথে কাটিং ড্রেজার না আনা পর্যন্ত কাতলারচর মৌজার বালু মহলটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এ ঘটনায় প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি।

এরপর থেকে সেই স্থানসহ আশে পাশের এলাকায় দিনের বেলা বালু উত্তোলন বন্ধ থাকলেও রাতের আঁধারে সেই কার্যক্রম অব্যাহত থাকে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা জানান, রাত ১১টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত একটানা ২০-২৫টি চুম্বক ড্রেজারের মাধ্যমে মেঘনা নদী থেকে তোলা বালু শত শত বলগেটে (বালু বহনের নৌকা) করে রাতারাতিই বিক্রি করা হয়। সেগুলো রাতের আঁধারেই লোড করে বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। একটা বলগেট ভরাট করতে একটি ড্রেজারের সর্বোচ্চ ২০-২৫ মিনিট সময় লাগে। প্রতি রাতে কোটি টাকার বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলে জানান তারা।
স্থানীয়রা আরও জানান, গত ৫আগষ্ট হাসিনা সরকার পতনের পর আওয়ামীলীগের নাম ভাঙ্গিয়ে নামে বেনামে বালু উত্তোলন করে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিলো বালু খেকোরা। তবে ৫আগষ্টের পর আমরা ভেবেছিলাম এবার থেকে হয়তো প্রতিবারের মতো নদী ভাঙ্গনের কবল থেকে রক্ষা পেতে যাচ্ছে মেঘনা পাড়ের মানুষ। কিন্তু না, এখন দেখছি যে সরকারই আসুক না কেন বালু উত্তোলন করে গ্রামের পর গ্রাম তারা বিলীন করে দিচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে কথা বললে শুরু হয় হুমকি ধামকি ও মারদরের ঘটনা। এখন দেখা যাচ্ছে শুধু মুখ বদল হয়েছে, সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নাই। দেশে এমন একটা অবস্থার মধ্যেও তারা প্রতিদিন শত শত বোলগেট বালু উত্তোলনের পর বিক্রি করছে। তাদের অদৃশ্য কোন ক্ষমতা থাকার কারনেই হয়তো তারা এগুলো করার সাহস পাচ্ছে।

এবিষয়ে হালিম, আমিনুল, খোরশেদ, জাহের আলীসহ একাধিক ব্যাক্তি জানান, গত কয়েক বছর ধরে নতুন কিছু দেখতে পাচ্ছি। বালু উত্তোলনে প্রশাসন বাঁধা দিলে তারা কয়েকদিন বন্ধ রাখে পরে আবার রাতের অন্ধকারে বালু উত্তোলনের কারণে নদী থেকে ভয়াবহ্ শব্দের উৎপন্ন হয়। রাতভর চলে বালু লুটের মহোৎসব তবে মাঝে মধ্যে খবর পাই মোবাইল কোর্ট আসে, সেসময় দু-একদিন বন্ধ থাকে পরে আবার আগের নিয়ম চালু হয়।
এদিকে প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১৮ কোটি টাকা দিয়ে কাতলারচর বালু মহলটির ইজারা নেয় মেসার্স আশরাফ ট্রেডার্স। কাটিং ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করার শর্তে ইজারা দেওয়া হলেও শর্তের তোয়াক্কা না করে প্রতিনিয়ত চুম্বক ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করছে ইজারাদার। তাই উক্ত স্থানে একাধিকবার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। বর্তমানেও তাদের দুটি ড্রেজার জব্দ করা অবস্থায় রয়েছে।
ড্রেজিয়ের কাজে সম্পৃক্ত এক ব্যক্তি জানান, আমরা হুকুমের গোলাম, আমরা মাইনা পাই রোজ হিসেবে। তবে শুনেছি মালিক পক্ষরা যা করেন সবকিছু উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নলেজে দিয়েই করেন। দিনের বেলা ড্রেজার চালালে নৌকা চলাচলে বেঘাত ঘটে, স্থানীয় জনগন এবং সাংবাদিকরা সমস্যা করে তাই রাতে বালু কাটি।
স্থানীয়দের অভিযোগ চানপুর এলাকার মামুন মেম্বার, আব্দুল্লাচর এলকার মনির হোসেন, আফজাল, আবুল মেম্বার, পলাশতলী এলাকার সাদীর ব্যপারী, আবদুল লতিফসহ আরো একাধিক ব্যক্তির সার্বিক তত্বাবধানে চলছে এই অবৈধভাবে বালু উত্তোলন।
এ ব্যাপারে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শফিকুল ইসলাম জানান, নির্ধারিত স্থান উপেক্ষা করে অন্যত্র বালু উত্তোলনের কারণে একাধিকবার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। চুম্বক ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করাই বালুর মহলটি প্রশাসন বন্ধ করে দিয়েছে। হোক দিনে কিংবা রাতে, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে কোন প্রকার ছাড়দেয়া হবেনা।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইকবাল হাসান জানান, রাতে বালু উত্তোলন হয় এমন কোন ভিডিও ফুটেজ দেখাতে পারলে অথবা রাতে বালু উত্তোলনের সময় আমাদেরকে অবগত করলে সরজমিনে গিয়ে ড্রেজার জব্দ করাসহ তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
এন’নস/এমনআ
Leave a Reply